১০৯। সূরা আল কাফিরুন (অবিশ্বাসীগন)
মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৬
পটভূমিঃ মক্কার কাফিররা যখন দেখলো মুহাম্মাদ (স) তাঁর দাওয়াত দেওয়া বন্ধ করছেন না এবং তাকে কিছুতেই কোনঠাসা, লোভ ইত্যাদি দিয়ে ফেরানো যাচ্ছে না তখন তারা একটা মীমাংসা প্রস্তাব নিয়ে এলো। তারা কিছুটা মুহাম্মাদ (স) এর অনুসরন করবে বিনিময়ে মুহাম্মাদ (স) কেও কিছুটা তাদের অনুসরন করতে হবে। তারা একবছর মুহাম্মাদ (স) এর দ্বীন পালন করবে, বিনিময়ে মুহাম্মাদ (স) একবছর তাদের দ্বীন পালন করবেন। একথা শুনে নবী মুহাম্মাদ (স) নিশ্চুপ ছিলেন, পরে এই পটভূমিতে এই সূরাটি নাযিল হয়, যেন এটাই হলো জবাব, হে নবী আপনি তাদের বলে দিন...
সারসংক্ষেপঃ সূরাটির ১ম আয়াত শুরু হয়েছে ‘কুল’ শব্দ দিয়ে। তখনকার কুরইশরা এই প্রস্তাব দিয়েছিল যে, তারা নবীর কিছু আচার আচরন, ধর্ম মানবে অন্যদিকে নবীকে তাদের কিছু আচার আচরন মানতে হবে। এক প্রকার আপোষ এ আসা বলতে যা বুঝায়। তখন আল্লাহ এখানে বিষয়টা হ্যান্ডেল করলেন। তিনি বোঝালেন, এই ডিসিশন দেয়ার বা আপোষ করার ক্ষমতা নবী মুহাম্মাদ (স) এর নাই। তাই এই আপোষ করা যে সম্ভব নয় সেটা আল্লাহ চুড়ান্ত করে দিলেন এবং নবী কে ‘কুল’ শব্দ দ্বারা শাব্দিকভাবে এটি বলার মাধ্যমে বোঝালেন যে এটা আল্লাহই বলতে বলেছেন এবং অবশ্যই আল্লহই পরের ডিসিশনটি দিয়েছেন। কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরুন না বলে ইয়া আয়্যুহাল কাফিরুন বললে এটা ভাবার হয়তো অবকাশ থাকতো যে, এটা নবী বলছেন কিন্তু কুল শব্দটি বলে আল্লাহ সেই অবকাশ দূর করে দিলেন। দ্বীনের কোন পরিবর্তন বিষয়ে আল্লাহ জিরো টলারেন্স দেখালেন। তাদের নির্বোধের মত অযৌক্তিক, অন্যায় দাবীর অসারতা প্রকাশ করতে আল্লাহ কড়া সম্বোধন এর মাধ্যমেই কড়া জবাব দেয়া শুরু করেছেন।
আবার কেউ যখন কারো উপর রেগে থাকে তখন ক্রোধ প্রকাশ করার জন্য বলে, ওকে বলে দিও... এভাবে আল্লাহও তাঁর ক্রোধ প্রকাশ করেছেন, তিনি কাফিরদের সরাসরি সম্বোধন করতে চান নি।
আরবীতে আনুষ্ঠানিকভাবে, গুরুত্বসহকারে কিছু বলার জন্য ‘ইয়া আয়্যুহা’ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এখানে এখানে এর পরে যা বলা হয়েছে তাহলো আল কাফিরুন। আল্লাহ তার নবীর মুখ থেকে মক্কার কুরইশ ও মুশরিকদের ‘কাফির’ বলে সম্বোধন করিয়েছেন। এটা খুব সাধারন একটা কথা ছিলো না, বরং তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সামনে এটা ছিলো বড় অপমানজনক একটা কথা। মুহাম্মাদ (সঃ) এর তেমন অনুসারী বা ক্ষমতার আধিক্য ছিলো না যে, তিনি নিজ থেকে তাদের মুখের উপর এত বড় কথা বলতে পারতেন। আবার তিনি নরম ও কোমল স্বভাবের ছিলেন, উম্মাতের প্রতি দয়ালু ছিলেন, কঠিন কথা সহজে তাঁর মুখ থেকে বের হতো না। এটা মূলত আল্লাহরই প্ল্যান ছিলো। এখানে ‘কাফিরুন’ শব্দটি Noun form এ আছে। ‘আল্লাযিনা কাফারু’ হিসাবে নাই অর্থাৎ Verb form এ নাই। Noun form স্থায়ী, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত জুড়ে এর কার্যক্রম। Verb form হলো Temporary. তখনকার কিছু কুরইশ বছরের পর বছর দাওয়াত পাওয়ার পরও এমন অবস্থায় পৌছেছিলো যে তাদের অবিশ্বাস permanent হয়ে গিয়েছিলো, তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে কুফরে লিপ্ত ছিল, তাদের ভবিষ্যতেও ইসলামে আসার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে গিয়েছিল যা আল্লাহ বুঝতে পেরেছিলেন এজন্য তিনি তাঁর নবীকে দিয়ে এমনটি বলিয়েছিলেন। এই সম্বোধন সবার জন্য ছিল না। অনেকেই আগে কুফরী করতেন তারা মুসলিম হয়েছেন। এই সম্বোধন ছিল কিছু নেতৃস্থানীয়দের জন্য যাদের ইসলাম গ্রহনের সব রকম সুবিধা দেয়া সত্ত্বেও তারা ইসলাম গ্রহণ করেন নি। অর্থাৎ আশেপাশের, রাস্তাঘাটের যাকে তাকে, সাধারন অমুসলিম প্রতিবেশি বা ইয়াহুদী, খ্রীস্টানদের ঢালাওভাবে ‘কাফির’ বলা যাবে না।
যারা কুফরী করেছে (আল্লাযী-না কাফারু) ও যারা কাফির (কাফিরুন) তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যারা কুফরী করেছে শব্দগুলো ক্রিয়া/কাজ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং কাফিরুন শব্দটি বিশেষ্য এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাধারনত ক্রিয়া পরিবর্তনশীল ও অস্থায়ী এবং বিশেষ্য গুনবাচক ও স্থায়ী হয়, অস্তিত্বের সাথে মিশে যায় এমন। ৭ নং আয়াতে এই বিষয়টি লক্ষ্যনীয়।
যারা কুফরী করেছে বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা অন্তরে কুফর লালন করে এবং তেমন কাজও করে তবে এখনো পুরাপুরি কাফির হিসাবে স্থায়ী ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি, এখনও তাওবার সুযোগ আছে। অপরদিকে কাফিরুন বলতে সেই সব মানুষদের বোঝায় যারা অন্তরে কুফর লালন করে এবং তেমন কাজও করে এবং কুফরীতে তারা স্থায়ী ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
এই পার্থক্য আল্লাহই ভালভাবে করতে পারেন।
আল্লাহ ৪ ধরনের মানুষদের ৪ ভাবে চিত্রায়িত করেছেন; ও হে যারা ঈমান এনেছ, মুমিন, ও হে যারা কুফরী করেছ, ও হে যারা কাফির। মুমিনদের একান্ত নৈকট্য ও যারা ঈমান এনেছে তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা দূরত্ব রাখলেও যারা কুফরী করেছে ও কাফির উভয়ের ক্ষেত্রেই আল্লাহ দূরত্বসূচক শব্দ ইয়া (ও হে) ব্যবহার করেছেন
মুহাম্মাদ (সঃ) তাদের ইবাদাত করতেন না যাদের ইবাদাত তারা করতো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) যার ইবাদাত করতেন তারা তার ইবাদাত করতো না। এই ‘ইবাদাত’ বিষয়টা বুঝতে এর অর্থ ভালোভাবে বোঝা জরুরী। ইবাদাত আসলে ২ টি কাজের সংমিশ্রন। ১। উপাসনা ও ২। দাসত্ব । যেকোন একটি অনুপস্থিত থাকলে ইবাদাত পরিপূর্ন হয় না।
দুই নামাজের মাঝের সময়ে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা হলো দাসত্বআনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহর উপাসনা করা ও উপাসনা বাদে অন্য সব সময়ে আল্লাহর দাসত্ব করাই হলো আল্লাহর ইবাদাত করা।
তৎকালীন কুরাইশরা ইবাদাত এর ২ টি ক্ষেত্রঃ ১। উপাসনা ও ২। দাসত্ব এর দুইটিই লঙ্ঘন করেছিলো। তারা এক আল্লাহর উপাসনা না করে আরো অনেক কিছুর উপাসনা করতো, আল্লাহর দাসত্ব না করে নিজের নাফস ও অন্য কিছুর দাসত্ব করতো।
সুতরাং তারা ইবাদতের হক রক্ষা করতে পারে নাই। সঠিকভাবে ইবাদাত করতে পারে নাই।
২য় আয়াত অনুযায়ী তখনকার কাফিররা মূলত মূর্তিপূজা ও তার অন্তরালে আত্মপূজা করতো, যা মুহাম্মাদ (সঃ) করেননি।
৩য় আয়াত অনুযায়ী অন্যদিকে মুহাম্মাদ (সঃ) এক আল্লাহর ইবাদাত করলেও তখনকার কাফিররা তা করতো না, বরং তারা তখন মূর্তিপূজা ও শিরক করতো। এখানে ‘আবিদুন’ বা ইবাদাতকারী বলা হয়েছে যা কিনা বিশেষ্যরুপ। বিশেষ্য হলো স্থায়ী রুপ। অর্থাৎ তারা আগেও আল্লাহর ইবাদাতকারী ছিল না, এখনও নাই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।৪র্থ আয়াতে বলা হচ্ছেঃ আমি নই ইবাদাতকারী যার ইবাদাত তোমরা করতে। অর্থাৎ আল্লাহর নবী জীবনে কখনই মূর্তি পূজা করেন নি, এতদিন যেহেতু করেননি তাই নবী হবার পর তো করার কোন প্রশ্নই নেই। কিন্তু কুরইশ এর কাফিররা অনেক আগে থেকেই এটা করে আসছিল।
৫ম আয়াতটি মূলত ৩য় আয়াতেরই হুবহু কার্বন কপি। গুরুত্ব বোঝাতে যেমন একই কথা ২ বার বলা হয় তেমনি এখানে একই আয়াত ২ বার ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষ রেগে গেলেও এক কথা ২ বার বলে। এখানে আল্লাহর রাগও প্রকাশ পেয়েছে। আগের আয়াতটি অতীত কাল সম্পর্কিত হওয়ায় এটিও অতীতের দিকেও নির্দেশ করছে। অর্থাৎ রাসূল আগে যার ইবাদাত করতেন কাফিররা তাঁর ইবাদাতকারী আগেও ছিল না।
তৎকালীন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ (স) এর ইসলামের দাওয়াতকে রুখতে না পেরে প্রস্তাব দিয়েছিলো যে, এসো আমরা (কাফির, মুশরিকরা) সবাই কিছু সময় তোমাদের দ্বীন (ইসলাম) মানবো আবার তোমরাও (মুসলমানরা) কিছু সময় আমাদের দ্বীন (শিরক) মানবে।
কিন্তু মুহাম্মাদ (স) কিছু সময় আল্লাহর উপাসনা করা আবার কিছু সময় অন্য কারো দাসত্ব করাঃ এমন দ্বীন মানতে পারেন নাই। এজন্য তিনি তাদের ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ঘোষনা দিয়েছিলেন যে, তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আমার দ্বীন আমার জন্য, যা বলা হয়েছে আয়াত ৬ এ। তিনি দ্বীনের সাথে কম্প্রোমাইজ করেন নাই।
তখনকার কাফিরদের দ্বীন ছিলো মূলতঃ শিরক, মূর্তিপূজা। মুহাম্মাদ (সঃ) ও মুমিনদের দ্বীন ছিলো তাওহীদ বা একত্ববাদ। শিরক ও তাওহীদ এই দুই দ্বীন এর মূলনীতিই আলাদা এবং একটি থাকলে আরেকটি থাকতে পারে না, মিলেমিশেও সহাবস্থানে থাকতে পারে না এবং কোন ছাড়ও দেয়া সম্ভব নয় তাই ২ টি দ্বীন সুস্পষ্টভাবে আলাদা হয়ে গেছে। এবং এই আলাদা হওয়া কোন বন্ধুত্বের আলাদা হওয়া নয় বরং দ্বন্দ্বের কারনে আলাদা হওয়া, সাথে সাথে চুড়ান্ত পরিনতির অপেক্ষা করতে থাকা।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ সূরা আল কাউসার এ জানা যায় যে, তৎকালীন কুরইশ, মুশরিকরা মুহামাদকে ‘আবতার’ (শিকড়কাটা) বলতো। কিন্তু আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেন যে, তিনি আসলে আবতার নন, বরং তার শত্রুরাই আবতার। অর্থাৎ আল্লাহ এখানে তাদের কথার ডিফেন্ড করেছেন ডিফেন্সিভ মুড এ। তারা যা বলেছে তা ঠেকিয়ে দিয়ে আবার তাদের দিকে কাউন্টার দিয়েছেন।
সূরা আল কাফিরুন এ আল্লাহ তাঁর নবীর পক্ষ থেকে তাদের কথার জবাব দেন এবং কাউন্টার এটাক এ যান। সূরা আল কাউসার এর ডিফেন্সিভ মুড এবার কাউন্টার এট্যাকের অফেনসিভ মুড এ কনভার্ট হয়। তাদেরকে আল্লাহ সরাসরি ‘কাফির’ হিসাবে সম্বোধন করতে বলেন। সুতরাং, কাফিররা মুহাম্মাদ (স) কে ‘আবতার’ বলেছিল। সূরা আল কাউসার এ মুহাম্মাদ (স) আল্লাহর সাহায্যে সেই অ্যাটাক হতে আত্মরক্ষা করে তাদেরই এটাক তাদের দিকে ফিরিয়ে দিলেন আয়াত ৩ এর মাধ্যমে। এরপর সূরা আল কাফিরুন এর ১ম আয়াতের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নির্দেশে অ্যাটাক করলেন তাদেরকে ‘কাফির’ বলে। তারা তাকে বাজে ভাষায় সম্বোধন করেছিল আল্লাহও তাঁর প্রিয় রাসূলকে ভিন্ন নামে তাদেরকে ডাকার অধিকার দিয়েছিলেন।
এছাড়া মুহাম্মাদ (স) এর শত্রুর কথা সূরা কাউসারে বলার পর সূরা আল কাফিরুন এ তাদের পরিচয় সরাসরি দিয়ে দেন আল্লাহ। এই শিকড়কাটাদের সাথে নবী মুহাম্মাদ (স) তাঁর সকল সম্পর্ক ও কেটে ফেলেন পরের সূরা আল কাফিরুন এ।
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ ১০৯ নং সূরা আল কাফিরুন (goo.gl/zvRLkM) এ ২ টা দ্বীন এর কথা এসেছে এবং তাদের পার্থক্যের কথা বর্নিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সত্যের চুড়ান্ত বিজয় হয় ও মিথ্যার চুড়ান্ত পরাজয় হয়। ২ টা দ্বীন এর মধ্যে ১১০ নং সূরা আন নাসরে (goo.gl/GSeZRZ) সত্য দ্বীনের বিজয়ের নমুনার কথা ও ১১১ নং সূরা লাহাব এ মিথ্যা দ্বীনের পরাজয়ের নমুনার কথা এসেছে। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!











মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন